কাবিননামা নিয়ে ধোঁয়াশা, নিবন্ধনকারী কাজীর বক্তব্যে মিলল অসঙ্গতির ইঙ্গিত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক আপত্তিকর ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তিনি মরিয়ম খাতুন নামের এক তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করলেও, প্রকাশ্যে আসা কাবিননামা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে সামনে আসা বিভিন্ন তথ্য সেই দাবিকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ভাইরাল ভিডিও প্রকাশের পর গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, মরিয়ম খাতুন এবং কনের বাবা মাসুম বিল্লাহ পৃথক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, পারিবারিকভাবে ৩ লাখ টাকা দেনমোহরে গত ১৭ জুন তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
তবে এই দাবির পর প্রকাশ্যে আসা কাবিননামা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। কাবিননামায় শ্যামনগর উপজেলার ১২ নম্বর গাবুরা ইউনিয়নের কাজী মাওলানা বি.এ.এম. বাকী বিল্লাহর নাম উল্লেখ রয়েছে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কাবিননামায় ১৭ জুন বিয়ের তারিখ উল্লেখ থাকলেও বিয়ে কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, সে বিষয়ে তার কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা নেই।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার দিবাগত রাতে ঢাকা থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয় যে বিয়েটি ঢাকায় সম্পন্ন হয়েছে এবং সেটি নিবন্ধন করতে হবে। পরদিন সকালে কনে ও তার অভিভাবক এসে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন। এমনকি কাবিননামায় ১৭ জুন তারিখ উল্লেখ করার নির্দেশনাও ফোনেই দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। একপর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কাজী বলেন, “আমাদের বিপদে ফেলা হয়েছে, আমি যাতে বিপদে না পড়ি।” এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে, কাবিননামায় মরিয়ম খাতুনের জন্মতারিখ ২২ মে ২০০৮ উল্লেখ থাকলেও একটি ফ্যাক্ট-চেকিং সূত্রের হাতে আসা তার জীবনবৃত্তান্তে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। ওই জীবনবৃত্তান্তে দেখা যায়, গত ২২ জুন—অর্থাৎ কথিত বিয়ের পাঁচ দিন পর—এমপি গাজী নজরুল ইসলাম সেখানে “জোর সুপারিশ করছি” লিখে স্বাক্ষর করেছেন। একই নথিতে মরিয়ম খাতুনের বৈবাহিক অবস্থা “অবিবাহিত”হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, যা বিয়ের দাবির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে কয়েকজন ব্যক্তি এক তরুণীসহ ঘিরে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। ভিডিওতে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “জামায়াত হয়ে এই কাজ কীভাবে করলেন? অন্যায় করেছেন কি না?” জবাবে তিনি মাথা নেড়ে “বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম” বলে মন্তব্য করেন বলে ভিডিওতে শোনা যায়। একই ভিডিওতে উপস্থিত তরুণীকে নিজের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি প্রথমে নীরব থাকলেও পরে নিজের নাম “মাহি” বলে জানান।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভাইরাল ভিডিও, বিয়ের দাবি এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শেষে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে দলটি।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য, প্রকাশ্যে আসা নথিপত্র এবং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।